Wednesday June 26, 2019
অতিথি কলাম
04 November 2017, Saturday
শিক্ষার পরিসরে নতুন বাস্তব নির্মাণ
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা   


শিক্ষাঙ্গনে বাইরের রাজনীতির অনুপ্রবেশ কাকে বলে? কী রূপে তা প্রকাশিত হয়? প্রশ্নটি নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নতুন ‘আমরা-তারা’-র পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে বর্ণের ব্যবহার সম্পর্কে প্রায় সবাই জানেন। নীল দল আওয়ামী লীগ পন্থী অন্যদিকে সাদা দলে আছেন বিএনপি-জামায়াত পন্থী শিক্ষকরা। ‘আমরা-তারা’র যে চিরায়ত ধারণা ছিল তা এবার বিসর্জনে গিয়েছে। নীল দলের ভেতরই এক ভয়ংকর ‘আমরা-তারা’ খেলা শুরু হয়েছে এবং সেটা হচ্ছে খুব কদর্যভাবে।

সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের অনুসারীরা এখন এতটাই কোনঠাসা যতটা তারা প্রতাপশালী ছিলেন যখন তিনি উপাচার্য ছিলেন। আরেফিন সিদ্দিক বিরোধীরা এখন ‘শাসন ক্ষমতায়’। এবং পরিস্থিতি এমন যে শিক্ষক-শিক্ষক, নীল দল-নীল দল এখন পরস্পরের মুখোমুখি। কখনও কোন এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কথা উচ্চারিত হচ্ছেতো, আরেক শিক্ষক তাকে ছাড়ছেন না কথা শোনাতে। সেগুলো আবার সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।

সমস্যা আছে, অভিমান আছে, উভয় তরফের বিচ্যুতিও আছে। এটা মেনে নিয়েই তারা যদি ভেবে দেখেন যে, অতি রাজনীতির প্রবণতা কিভাবে কমানো যায় তবেই জাতির উপকার হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একটি গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশের দাবি ওঠে। অধ্যাদেশের দাবিতে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শুরু হয় আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান শিক্ষকদের দাবি মেনে নিয়ে ১৯৭৩-এ অধ্যাদেশ জারি করেন যা ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ নামে পরিচিত। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেট থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনজনের একটি প্যানেল চ্যান্সেলরের কাছে পাঠাতে হবে।

তিনজনের মধ্য থেকে চ্যান্সেলর মহোদয় যে কোন একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করবেন। সিনেটে ছাত্র, শিক্ষক ও সমাজের প্রতিনিধের সমন্বয়ে ক্যাম্পাস গণতন্ত্রের এক নতুন যুগের সূচনা করলো। তবে ১৯৭৩ অধ্যাদেশটির কার্যক্রম শুরু হতে না হতেই ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে দেশে শুরু হয় সামরিক শাসন। সামরিক শাসন জারি হবার পর জেনারেল জিয়া ১৯৭২ সালের সংবিধানে নানা পরিবর্তন নিয়ে আসে, তবে ১৯৭৩ অধ্যাদেশটিতে কোনরকম হস্তক্ষেপ করেনি তখনকার সরকার।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না, ফলে ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই সিনেট অধিবেশন করতে হয়। আর এতে করে গণতান্ত্রিক কাঠামোটিই আর বাস্তবে উপস্থিত নেই। ডিন নির্বাচন এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে অধ্যাদেশটি মানা হলেও উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাদেশটি নানাভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জেতার পর অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে অস্থায়ীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়। চ্যান্সেলর তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছিলেন, তবে শর্ত ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য সিনেটের অধিবেশন ডেকে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনজনের একটি উপাচার্য প্যানেল তৈরি করে চ্যান্সেলর মহোদয়ের কাছে পাঠাবেন এবং সে প্যানেল থেকে চ্যান্সেলর যে কোন একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করবেন। এই এডহক নিয়োগে চার বছর কাটিয়ে দিয়ে আরেফিন সিদ্দিক সিনেটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্যানেল মাননীয় চ্যান্সেলরের কাছে পাঠিয়েছিলেন। প্যানেলে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের নাম ছিল। যেহেতু তিনি অস্থায়ীভাবে কর্মরত উপাচার্য ছিলেন, তাঁকেই চ্যান্সেলর চার বছর মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এখানে ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ আইনীভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলা হয়তো যাবেনা, কিন্তু চতুরতা ছিল অনেকটাই।

আট বছরের বেশি সময়ে আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভালই চলছিল। সেশন জট ছিলনা, ক্যাম্পাসে সহিংস ছাত্র রাজনীতি ভালভাবেই নিয়ন্ত্রিত ছিল, ফলে বড় কোন সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। সমস্যা তৈরি হয় নীল দলেরই একটি অংশ যখন বুঝতে পারেন অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে আরও এক বারের জন্য উপাচার্য হতে আগ্রহী, তখনই তারা নড়েচড়ে বসেন। অবশ্য তার আগেই নীল দলের ভেতরে ভাঙন স্পষ্ট হয়ে উঠে এবং বিচার শেষ পর্যন্ত গণভবনেও গিয়েছিল। সিনেটের শিক্ষক সদস্য নির্বাচনের সময় প্রগতিশীল শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন এতটা মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের বিভাজন ঠেকাতে শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন কোনরকমে পার করা গেলেও সিনেট কর্তৃক উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতির আবার অবনতি ঘটে।

নীল দলের আরেফিন বিরোধী শিক্ষক গ্রুপ যখন বুঝতে পারেন কর্মরত উপাচার্য সিনেটের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো উপাচার্য হতে আগ্রহী, তখন প্রগতিশীল শিক্ষকদের বেশ কিছু সদস্য সিনেট সভা বর্জন করেন। ছাত্র বিক্ষোভ, ছাত্র-ছাত্রীদের উপর কতিপয় শিক্ষকের হামলাসহ নানা ঘটনার মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে তিন জনের প্যানেলের নাম পাঠানো হয় যেখানে আরেফিন সিদ্দিকের নামও ছিল। এর মধ্যে আদালতেও যায় বিষয়টি। তবে শেষ পর্যন্ত চ্যান্সেলর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর আক্তারুজ্জামানকে অস্থায়ীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিলে বিদায় নিতে হয় অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিককে।

নীল দলের বিভাজন ক্যাম্পাসে এক অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও তার ছোঁয়া লাগবেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে প্রত্যাশা আছে। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। উপাচার্য নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে নৈরাজ্যকর কিছু ঘটলে তা দুঃখজনক। সব শিক্ষক রাজনীতি করেন না, পদ পদবীর লড়াইয়েও নামেন না। তারা এই অস্থিরতা ও উগ্রতা দেখে হতাশ হচ্ছেন।

সুস্থতার এক নতুন আলোড়ন তৈরির কাজটি করতে হবে শিক্ষকদেরই। ক্যাম্পাসকে হিংসামুক্ত করতে পারেনা তারাই। এই হিংসা বা প্রতিহিংসার চর্চার জন্য বাইরের রাজনীতিই দায়ী। যেদিন থেকে শিক্ষকরা নিজেদের সমস্যার সমাধানে বাইরের সাহায্য চাইতে শুরু করলো সেদিন থেকে সমস্যা আরও বাড়তে থাকলো। কারণ সে সাহায্য রাজনৈতিক। সমাজজীবনে জ্ঞানচর্চা ও স্বার্থবহ সমাজচেতনা এক নয়। শিক্ষকেরা যদি শিক্ষাঙ্গনের স্বার্থ অপেক্ষা বাইরের রাজনৈতিক গোষ্ঠীজীবনের প্রতি আনুগত্যকেই অধিকতর গুরুত্ব দেন, তবে অনৈক্যই বিদ্যমান থাকবে, শান্তি ফিরবে না।

শিক্ষার পরিসরে নতুন বাস্তব নির্মাণের দায়িত্ব শিক্ষকদেরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্মানিত শিক্ষকদের এই গ্রুপিংটাই এখন নতুন বাস্তব। শিক্ষকদের নিজেদের ভেতরকার সম্পর্ক এমন তলানিতে কী ভাবে পৌঁছল, তার একটা অনুসন্ধান প্রয়োজন। অতি-রাজনীতির ঘেরাটোপে আবদ্ধ থেকে শিক্ষকরা কিছু স্বাভাবিক বিচ্যুতিকেই অসামান্য করে তুলছেননাতো? শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ না করে তারা সম্পর্কটাকে মেরামত করেন, তবেই অনেকটা পথ পেরোতে পারবেন তারা। সমস্যা আছে, অভিমান আছে, উভয় তরফের বিচ্যুতিও আছে। এটা মেনে নিয়েই তারা যদি ভেবে দেখেন যে, অতি রাজনীতির প্রবণতা কিভাবে কমানো যায় তবেই জাতির উপকার হয়।

লেখক : বার্তা পরিচালক, একাত্তর টিভি।

০৭.১০.২০১৭/ফাস্টনিউজ/এআর/২৩.০০
অতিথি কলাম :: আরও খবর