Wednesday June 26, 2019
অতিথি কলাম
07 July 2018, Saturday
খেলারাম
খুকু খালেদ
    
 
 
থমথমে মুখে নীলা লাইব্রেরি রূমের দিকে ছুটে চলে। করিডোরে এক ছাত্রের সাথে ধাক্কা খায়।দোষটা নীলারই।তারপরও ছেলেটা সরি বলে পাশ কাটে।ভদ্র মেয়ে নীলা, কিন্তু এখন তার ঐ হুস নেই।পুরা মাথাটাই রাগে টনটন করছে।আজ উর্মির সাথে ফয়সালা করতেই হবে।হয় ঐ বানদরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আর নয় নীলার সাথে।

রূমের এককোনায় বসে উর্মি বইর মধ্যে ডুবে আছে।নীলা সামনে যেয়ে বইটা টান মেরে সরিয়ে নিয়ে বলে আর কতো বানদিগিরী করবি ঐ বানদরের? সপ্তাহে দুইদিন প্রেমের মসলা দিয়ে রান্না করে টিএসসির চিপায় বসে বানদরে হাতে তুলে খাওয়াবি, লাইব্রেরিতে বসে নোট করে দিবি।আর বানদের হুকুম পালনের জন্য অলওয়েজ রেডী থাকবি।এই তো তোর জীবনের উদ্দেশ্য! আর বানদরটা তোর উপর তার জীবনের সাফসাফল্য তুলে দিয়ে আরামে এক এক দিন এক সুন্দরী ললনা নিয়ে রামলীলা করে বেড়াবে।

উর্মি দাড়িয়ে নীলার হাত ধরে বাইরে যেয়ে করিডোরের এক কোনে নিয়ে বলে,কি হয়েছে শুনি?হঠাত এতো রাগ কেন? নীলা সত্যি রেগে আছে।বলে, জানিস না আমি কি বলতে চাই? তোর বদটা এখুনি দেখে এলাম মসজিদের পাশের গেটে দাঁড়িয়ে আর এক রিকশা এদিক থেকে ওর সামনে গিয়ে থামল আর বদটা টপ করে রিকশায় উঠে গেল। আর কতো সহ্য করবি বলতো উর্মি?

উর্মি কোন কথা বলেনা,মাথাটা নীচু করে বলে হয়তো কোন কাজে গেছে। নীলা রাগে গজগজ করতে করতে বলে আর কতো অজুহাত দিবিরে? সবাই জানে ঐ বানদরের চরিত্র কেমন? তুইও জানিস।তারপর আর কতো ওর সাফাই গাইবি?আসলে তোর সেলফ রেসপেকট বলতে কিছু নেই।সুন্দর মূলাটার সাথে ঘুরেই তোর জীবন সার্থক!!

দোহাই তোর এবার ছাড় ওকে! আমার খুব খারাপ লাগেরে তোর জন্য।এমন জান প্রান দিয়ে যার জন্য করিস অথচ সে তোকে কতোটুকু মূল্যায়ন করে বল। ওর বন্ধুরা পর্যন্ত ওকে তোর কথা বললে শয়তানটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে কলুর বলদ আমার। আমার অবাক লাগে তুই কি দিয়ে তৈরী?ছেড়ে দে ওকে। ও কোনমতেই তোর যোগ্য না।তোর জন্য অনেক কষ্ট হয়রে।কোনদিন বলেছে তোকে ভালবাসি? না বলেনি।কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে ভালো বন্ধু। আর তুই ? একদম তোর কৃষ্ণ ঠাকুর। ওকে পুজো দিয়েই চলবি।উর্মি আর দাড়ায় না হলের দিকে হাঁটা দেয়।মনের কালো মেঘটা বুঝতে দেয় না।

হলে এসে সোজা রূমে যেয়ে শুয়ে পড়ে।নীলা ওর পিছন পিছন আসে।জানে উর্মি আজ বিছানা থেকে উঠবে না,খাবে না যদিনা নীলা জোর করে খাওয়ায়। রুমমেট ওরা।দুজন একই বিভাগে না পড়লেও ক্লাসের বাইরে দুজন সারাক্ষণ একসাথে থাকে।বন্ধুরা বলে জুরূয়া।ওরা কিছু মনে করেনা বরং খুশী হয়। নীলার কাছে উর্মির কিছুই গোপন না।ও জানে শাহরিয়ারকে উর্মি কতো ভালোবাসে।দেখতে সুন্দর শাহরিয়ারের পিছনে অসংখ্য মেয়ে লেগে থাকে আর ও সেই সুযোগ হাতছাড়া করার মানুষ না।একই ক্লাসে পড়ে দুজন।নীলার সাথে আলাপ করানোর পর।খুব আগ্রহ নিয়ে আলাপ করেছে।দেখা হলে গায়ে পরে কথা বলে।কেমন যেন একটা ছোক ছোক স্বভাব! নীলার ভালো লাগেনি।উর্মিকে বলেছে শাহরিয়ারকে শুধু বন্ধু হিসেবে ভাবতে না হলে কষ্ট পেতে হবে।কিন্তু নীলা কি পণ করেছে কে জানে? ও ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু ভাবে না।

আজ উর্মিকে নীলা এতোকিছু বললো কোন লাভ নেই।মন খারাপ করে পরে থাকবে।বিকাল হলেই ও ফোন দিবে আর নীলা সুন্দর করে সেজে গুজে বের হবে।তারপর তিন চার ঘনটা ওর সাথে কাটিয়ে আসবে।মাঝে কোথায় যেন নিয়েও যায়।ফিরে এসে কি খুশী থাকে উর্মি।নীলা অনেক কিছু বুঝেও কিছু বলে না।থাক উর্মি ভালো থাকলে খুব ভালো লাগে।কিন্তু যখনই শাহরিয়ারের সাথে অন্য মেয়েকে দেখে ওর মাথা খারাপ হয়ে যায়। ওর জানের জান বানধবীকে ঠকাচ্ছে দেখে। দুই একবার শাহরিয়ারকে বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু ছেলেটা এতো চালাকি করে কথাটা অন্যদিকে ঘুরিয় দেয়া।শাহরিয়ার বুঝিয়ে দেয় যে ওরা শুধুই বন্ধু আর ও কাউকে কখনো জোর করে না।

এভাবেই তিন বছর পার করেছে ওরা।ফাইনাল ইয়ারে এসেও ওদের সম্পর্ক ঐ ভাবেই চলছে।উর্মির ও কোন আপত্তি নেই।অনার্স ফাইনাল দিয়ে যে যার বাড়ি যায়।লম্বা ছুটি,রেজাল্ট হবে তারপর মাস্টার্সের ক্লাস শুরু।নীলা বলেছে একবার আর এভাবে না থেকে ওর সাথে কথা বলে ভবিষ্যত ঠিক করতে।উর্মি শুধু বলেছে সে কিছুই বলবে না।শাহরিয়ারই বলুক।এক সময়ে ওদের ক্লাস শুরু হলো সবাই ফিরে এলো।নীলা খেয়াল করলো উর্মি কেমন আনমনা থাকে।নীলা জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলো বাড়িতে উর্মির বিয়ে ঠিক করছে মাস্টার্স করতে করতে বিয়ে সেরে ফেলতে হবে।নীলা বললো,কি করবি এবার? বল ওকে ? নীলা চুপ করে থাকে। চুপ থাকলে হবেনা উর্মি? শাহরিয়ারের সাথে এবার ফাইনাল কর। উর্মি বলে,কিভাবে বলব ও যদি এখন বিয়ে করতে রাজী না হয়? নীলা রাগ হয়ে যায়।বলে, কেমন প্রেম তোর।সব করবি অথচ বলতে পারবি না এটা প্রেম।হায়রে উর্মি তুই কি দিয়ে যে তৈরী?
অবশেষে উর্মি নীলার কাছে হার মানে।বলে,নীলা আমার একটা উপকার করবি? শাহরিয়ার কি চায় জিজ্ঞেস করতে পারবি? নীলা মনে মনে তৈরী ছিল যে ওর সাহায্য চাইবে।নীলা বলে,আমি বলবো কিন্তু শর্ত তোকে সামনে থাকতে হবে।উর্মি প্রথমে রাজি হয়না কিন্তু নীলার এক কথা যা কথা সব তোর সামনে হবে।

অবশেষে তাই হলো কারন আর সময় নেই।একদিন বিকেলে টিএসসির এককোনে ঘাসের উপর ওরা তিনজন বসে।নীলা ওর মতন করে শুরু করে।উর্মির মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে ও ভিতরে কতোটা নার্ভাস হয়ে আছে।বল,শাহরিয়ার তিন বছর তোমরা যেভাবে মেলামেশা করো তাতে করে দুজনের উপর দুজনের যথেষ্ট দাবী তৈরী হয়েছে। আর অবশ্যই এটা প্রেমের সম্পর্ক। আর এর পরিনতি অবশ্যই বিয়ে।তোমার এখন ঠিক করতে হবে উর্মিকে বিয়ে করার জন্য।কারন ওর বিয়ে ঠিক করেছে।আর সময় দিবে না ওর পরিবার।

শাহরিয়ার অবাক হয়ে একবার উর্মি একবার নীলার দিকে তাকায় যেন আকাশ থেকে পড়লো।

অনেকখন কোন কথা বের হয়না মুখ থেকে। উর্মি আনমনে ঘাস ছিড়তে থাকে।নীলা বলে,পলীজ কথা বলো?তুমি জানো উর্মি তোমাকে কতোটা ভালোবাসে, আর তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতেও পারেনা।

শাহরিয়ার বলে উঠে, ভাবতে বলেছে কে ওকে? উর্মি অবাক হয়ে শাহরিয়ারের মুখের দিকে তাকায় যেন শাহরিয়ার অচেনা কেউ।উর্মির দিকে তাকিয়ে বলে,অভিনন্দন উর্মি।দুই বানধবী মুখ চাওয়া চাওয়ি করে।নীলারাগ হয়ে বলে,এসব কি বলছো তুমি?তিন বছর চুটিয়ে সব করলা আর এখন এই বলছো?শাহরিয়ারবলে, নীলাকে জিজ্ঞেস করো আমি কখনো ওকে জোর করেছি? আর কখনো বলেছি এটা প্রেম? আমরা কখোনো কমিটেড ছিলাম না। উর্মি দুচোখ জলে ছলছল করছিল অসহায়ভাবে দুজনের দিকে তাকাচ্ছিল শুধু।

নীল বহু কষ্টে ওকে একটা চড় মারার ইচছা দমন করে।
শাহরিয়ার আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিল, উর্মি নীলার হাত ধরে টেনে উঠে চলে যায়। এই প্রথম উর্মির আচরনে নীলা ভিতরে ভিতরে খুশী হয়। এমনটাই হওয়া উচিত।উর্মিঐদিন এনিয়ে কোন কথা বলে না।পাথর হয়ে গেছে যেন।

কয়েকদিন আর শাহরিয়ারের সাথে কথা নেই।উর্মি বাড়ি চলে যায় বিয়ের জন্য।নীলাই সব গুছিয়ে দেয়।ও যাবে বিয়েতে তবে কয়দিন পর।

এর মাঝে একদিন শুধু ঐ কথা উঠেছিল।নীলা বলেছিল,উর্মি শাহরিয়ারের বেপারে নিশ্চয়ই আর কিছু বলার নেই?উর্মি মাথা নেড়েছিল নেই।

শাহরিয়ারের জীবনে আর উর্মি নেই।বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলে বলে,ওর বিয়ে হবে তাই বাড়ি চলে গেছে।বন্ধুরা ততোদিনে সব জেনেছে।বল,তোর খারাপ লাগছে না?শাহরিয়ার বলে,কেন খারাপ লাগবে? কেউ কিছু বলে না। দিন যেতত থাকে।শাহরিয়ারের জীবনে ছনদপতন হয়।কি যেন নেই।বড় খালি খালি লাগে।কোন কিছুতে মন নেই। পড়া লেখাতে মন নেই। সবকিছু অসহ্য হয়ে উঠে।পাগল পাগল লাগতে থাকে।যেই শাহরিয়ার বানধবী ছাড়া চলতো না,বানধবীদের এড়িয়ে চলতে লাগল। ধীরে ধীরে ওর জীবনে উর্মির অভাব টের পেতে থাকে। ও বুঝতে শুরু করেছে উর্মির আর ওর সক্তা কবে যেন এক হয়ে গেছে। উর্মিকে ছাড়া শাহরিয়ারের জীবন অচল।

ছুটে যায় নীলার কাছে।নীলা অভিভূত হয় উর্মির ভালোবাসায়।কতো ভালো মনদ বলেছে শাহরিয়ারের বেপারে। এখন বুঝেছে উর্মির ভালোবাসার জোর।

উর্মি শাহরিয়ারকে বলে,এটা আপনার ভালোবাসা না।আপনার অভ্যাস।কয়দিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।মানুষ মাত্রই অভ্যাসের দাস।শাহরিয়ার বলে,নীলা যদি বল তো এই অভভাসই আমার ভালোবাসা।আমি এই অভভাস আজীবন আকড়ে থাকতে চাই।উর্মিকে ছাড়া আমি বাচঁব না!

ওরা দুজন উর্মিকে আনতে যায়। নীলার মনটা প্রশানতিতে ভরে থাকে।কষ্ট পেয়ে পেয়ে তিনটা বছর ভালোবেসেছে ওকে।আজ ও শাহরিয়ারের জীবনে নেই আর এখন ওর ভালোবাসা অনুভব করছে।কি একনিষ্ঠ ছিল উর্মির শাহরিয়ারের প্রতি ভালোবাসা। জিতে গিয়েছে উর্মি।

০৭.০৭.২০১৮/ফাস্টনিউজ/এমআর/২১.৫৫
অতিথি কলাম :: আরও খবর